অদ্বৈত মল্লবর্মণের উপন্যাস : বিষয় ও শিল্পরূপ



অদ্বৈত মল্লবর্মণের উপন্যাস : উপেক্ষিত এক অসাধারণ সাহিত্যধারা

বাংলা সাহিত্য নিয়ে কথা বলতে গেলে কিছু নাম আমাদের চোখে ভাসে খুব সহজেই। কিন্তু এমনও কিছু লেখক আছেন যাদের অবদান অনন্য হলেও তারা সময়ের প্রবাহে ক্রমশ আড়ালে চলে যাচ্ছেন। অদ্বৈত মল্লবর্মণএমনই এক গভীর কণ্ঠস্বর, যার শব্দ, যার বেদনা, যার নদীভরা উপাখ্যান, আমাদের বাংলার ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।

আমরা অনেকেই তাঁকে জানি একটাই উপন্যাসের মাধ্যমেতিতাস একটি নদীর নাম সত্যি বলতে, এই অসাধারণ কাজটিই তাঁকে বাংলা সাহিত্যজগতে অমর করেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলোএতেই কি শেষ?

তিনি কি শুধু একটি নদীর গল্প লিখেছিলেন?

না।

অদ্বৈত মল্লবর্মণের সাহিত্যজগত এতটুকুতেই সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর রাঙামাটি, সাদা হাওয়া, এবং কম পরিচিত কিন্তু গভীরভাবে গুরুত্বপূর্ণ অনুবাদ উপন্যাসজীবন তৃষ্ণাসবগুলোই তার সাহিত্যচেতনা এবং মানবিক দর্শনের বহুমাত্রিক প্রমাণ।

দুঃখের বিষয়, তাঁর এই অন্যান্য কাজগুলো যেন অন্ধকারে পড়ে আছে। পাঠকসমাজ, সমালোচক এবং গবেষকদের অবহেলা যেন এই বিরল প্রতিভাকে আমাদের চোখের আড়ালে রেখে দিয়েছে। আমরা যখন অন্য সাহিত্যিকদের নিয়ে এত লিখি, পড়ি, গবেষণা করি, তখন কেন অদ্বৈত মল্লবর্মণের মতো সাহিত্যকার অবহেলিত হবেন?


কেন নতুন করে তাঁর উপন্যাসগুলো নিয়ে কথা বলা জরুরি?

অদ্বৈত মল্লবর্মণের সাহিত্য শুধু গল্প নয়এগুলো সমাজের নীচুতলার মানুষের জীবনযাত্রা, সংগ্রাম, ভাষা, সংস্কৃতি এবং বেদনাকে নতুন করে তুলে ধরে। বিশেষ করে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে তিনি যেভাবে উপস্থাপন করেছেন, তা বাংলা উপন্যাসে অত্যন্ত বিরল।

  • তাঁর চরিত্রগুলো রক্তমাংসের মানুষ
  • ভাষায় রয়েছে নিজস্ব আঞ্চলিক স্বাদ
  • প্রেক্ষাপট বাস্তবতা মানবিকতায় ভরপুর
  • সমাজ, অর্থনীতি সংস্কৃতির গভীর টানাপোড়েন পাওয়া যায় তাঁর প্রতিটি লাইনে

অর্থাৎ, তাঁর উপন্যাসগুলো শুধু সাহিত্য নয়এগুলো ইতিহাস, সমাজ, সময় আর মানুষের গল্প।


গবেষণার প্রয়োজনীয়তা

সময়ের সাথে সাথে সাহিত্যকর্মগুলো আড়ালে চলে যায়। কিন্তু সব লেখক কি সমানভাবে আড়ালে যাওয়ার যোগ্য?
অদ্বৈত মল্লবর্মণের মতো একজন লেখকযিনি তাঁর লেখায় নদী, মানুষ, শ্রেণীসংগ্রাম, নির্দয় বাস্তবতা এবং সভ্যতার সীমান্তকে স্পর্শ করেছেনতাঁকে অবহেলা করা মানেই বাংলা সাহিত্যকে অবহেলা করা।

এই কারণেই তাঁর সব উপন্যাসকে নিয়ে একটি ভিত্তিসম্পন্ন, বিশ্লেষণমূলক, মানবিক গবেষণা আজ অত্যন্ত প্রয়োজন। না হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম জানবেই না কতটা সংগ্রাম, ব্যথা এবং সৃষ্টিশীলতার মধ্য দিয়ে এক সাহিত্যিক তাঁর মননকে প্রকাশ করেছিলেন।


আমাদের প্রত্যাশা

যদি তাঁর সাহিত্য নিয়ে গভীরভাবে গবেষণা হয়, তাহলে

  • বাংলা উপন্যাসচর্চা সমৃদ্ধ হবে
  • প্রান্তিক মানুষের বাস্তব গল্প পাঠকের কাছে পৌঁছাবে
  • আঞ্চলিক সংস্কৃতি, ইতিহাস ভাষার আরও সুন্দর পুনর্নির্মাণ ঘটবে
  • অদ্বৈত মল্লবর্মণ তাঁর যোগ্য মর্যাদা ফিরে পাবেন

আমরা বিশ্বাস করি, তাঁর সাহিত্য নতুন করে পাঠককে ভাবাবেসমাজ নিয়ে, মানুষ নিয়ে, সময় নিয়ে।


শেষকথা

অদ্বৈত মল্লবর্মণ শুধু একজন লেখক নন; তিনি ছিলেন মানুষের গল্প বলা এক জাদুকর।
যদি আমরা আজ তাঁর সাহিত্যকে ভুলে যাই, তবে বাংলা উপন্যাসের একটি বিশাল অংশ অন্ধকারে হারিয়ে যাবে।

তাই এখনই সময়
তাঁর উপন্যাসগুলোকে আলোয় ফেরানোর, গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত করার, এবং নতুন প্রজন্মের হাতে তুলে দেওয়ার।

সাহিত্য শুধু লেখা নয়এটি একটি উত্তরাধিকার।
অদ্বৈত মল্লবর্মণ সেই উত্তরাধিকারের অন্যতম স্তম্ভ।

এখন দায়িত্ব আমাদেরতাঁকে ভুলে না যাওয়া।

 

অদ্বৈত মল্লবর্মণের উপন্যাস : বিষয় ও শিল্পরূপ | বাংলা সাহিত্য বিশ্লেষণ
////////////////

সহায়ক গ্রন্থপঞ্জি

  • মোস্তাক আহমাদ দীন, অদ্বৈত মল্লবর্মণের লোকসাহিত্য-বিবেচনা, বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি, ২০১৬।
  • শাহিনা আক্তার, অদ্বৈত মল্লবর্মণের জীবনকথা ও সাহিত্যকর্ম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ২০১৮।
  • সরকার সোহেল রানা, অদ্বৈত মল্লবর্মণের মননচিন্তা, কালি ও কলম।
  • অচিন্ত্য বিশ্বাস, অদ্বৈত মল্লবর্মণ, সাহিত্য অকাডেমি, নতুন দিল্লি, ২০১৪।
  • অদ্বৈত মল্লবর্মণ, রচনাসমগ্র, সম্পা. অচিন্ত্য বিশ্বাস, দে’জ পাবলিশিং, ২০১১।
  • অদ্বৈত মল্লবর্মণ, রচনাবলী (অখণ্ড), সম্পা. ইসরাইল খান, সূচীপত্র, ঢাকা, ২০১৫।
  • তপোধীর ভট্টাচার্য, অদ্বৈত মল্লবর্মণ, পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি, ২০০০।
  • দেবীপ্রসাদ ঘোষ, অদ্বৈত মল্লবর্মণ: একটি ভিন্ন প্রতিস্রোত, গাঙচিল, ২০১৮।
  • বিশ্বজিৎ ঘোষ, তিতাস একটি নদীর নাম: জল ও জীবনের বিকল্প নন্দন, উলুখাগড়া, ২০০৫।
  • শান্তনু কায়সার, অদ্বৈত মল্লবর্মণ: জীবন, সাহিত্য ও অন্যান্য, নয়া উদ্যোগ, ১৯৯৮।
  • সিরাজ সালেকীন, অদ্বৈত মল্লবর্মণ: জীবন যখন সাহিত্য, সাহিত্য পত্রিকা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ২০১৪।
  • সুশান্ত হালদার, তিতাস একটি গ্রন্থের নাম, চতুর্থ দুনিয়া, কলকাতা, ১৯৯৪।
To Top